দীর্ঘদিন পর একটা আত্মজীবনী শেষ করে মনে হল নাহ,জীবনকথা লিখবার হলে এভাবেই লিখতে হয়, এমনতরভাবেই গোছাতে হয়। শুধু আমিত্বে আত্মের কথা বলা সম্পূর্ণ হয় না, আমরা'য় নিমজ্জিতে পূর্ণতা পায় আত্মকথা। সেই পূর্ণতাকে আরো রাঙিয়ে তোলে, আত্মকথার রচিয়তা যে যুগের সন্তান, সেই সময়ের আর্থসামাজিক জীবন যখন অমলিনভাবে উপস্থাপিত হয় লেখাতে, স্মৃতিতে।
সাহিত্যিক, সাংবাদিক, আইনজীবী এবং আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদের "আত্মকথা " বাঙালি মুসলমানের সময়কে ধারণ করেছে যে সময়ে হয়েছে দেশভাগ, হয়েছে সাম্প্রদায়িক তিক্ততা, বেড়েছে ক্রোশ ক্রোশ দূরত্ব। বেশকিছু বেসিক প্রশ্নের মাধ্যমে, ঘটনা বর্ণনার প্রেক্ষিতে মনে বদ্ধমূল কিছু ধারণায় ধাক্কা দিয়েছেন আবুল মনসুর আহমদ। যেমনঃ বাটোয়ারাপূর্ব সাহিত্যে বাঙালি মুসলমান নাই। অথচ বাঙালি মুসলমানরাই ছিল সংখ্যাগুরু। কেন নাই? এক সম্প্রদায় অপর সম্প্রদায়ের ভালো মানতে রাজি না। কেন? এমনই বাঙালি মুসলমানের হালঃ
"আরেকটি মজার ব্যাপার এখানে উল্লেখ না করিয়া পারিতেছি না বন্ধুবান্ধবের কাছে শুনিলাম, কলিকাতার বেশ্যারাও মুসলমান খরিদ্দার গ্রহণ করে না । পরে এই কথার এইরূপ ব্যাখা শুনিলাম যে মুসলমান খরিদ্দারদিগকেও "হিন্দু বেশে" অর্থাৎ ধুতি পরিয়া বেশ্যাবাড়িতে যাইতে হয়। " ( পৃষ্ঠা ১৭৭)
আত্মজীবনী হিসেবে এর একটি বিশেষত্ব অধ্যায়ভিত্তিক আকারে তা লেখা। সাধুভাষায় পুরো বই। অথচ পড়তে গিয়ে তা টেরই পাইনি। খুবই সুলিখিত।
জনাব আবুল মনসুর তাঁর বইতে অনেক অজানা তথ্য, ঘটনার কথা লিখেছেন। যেকোনো কৌতূহলী পাঠকমাত্রই তা লুফে নেবে। যেমনঃ দ্বিতীয়পর্যায়ে নবযুগ পত্রিকার সম্পাদনা করছেন আবুল মনসুর। কিন্তু সম্পাদক হিসেবে কাজী নজরুলের নাম ছাপা হত। এই সময়েরই ঘটনা, তখনও নজরুল অসুস্থ হননি। পড়ুন মনসুর সাহেবের জবানিতে,
"ইতিমধ্যে নজরুল ইসলাম সাহেবের মধ্যে একটু-একটু মস্তিষ্ক বিকৃতি দেখা দিল। আগেই শুনিয়াছিলাম, তিনি বরদাবাবু নামে জনৈক হিন্দু যোগীর নিকট তান্ত্রিক যোগ সাধনা শুরু করিয়াছেন।" ( পৃষ্ঠা ২৯৭)
আবুল মনসুর শতভাগ রাজনীতিক তা পুরো বই পড়তে গিয়ে মাথায় রেখেছিলাম। তাঁর নীতি বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতি হিন্দু বাঙালি হতে আলাদা। তাই তাদের কথাসাহিত্য প্রভৃতিও আলাদা হবে ইত্যাদি তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন। লিখেছেনও তা সোজাসুজি। তবে কি মনসুর সাহেব সবক্ষেত্রে ঘটনা বয়ানে সাধুতা রক্ষা করেছেন বলতে পারিনা। কেননা পুরো বই পড়ার পর বাঙালি মুসলমান সন্তান আবুল মনসুর আহমদকে অনেকখানি ভুল-ত্রুটির ঊর্ধে বোধ হয়। তাতেই ফিকে হয়ে আসে আত্মজীবনী লিখবার অন্যতম শর্তঃ নিজের প্রতি সৎ থেকে যতদূর সম্ভব নিরপেক্ষভাবে স্মৃতিকে ঘাঁটিয়ে তার বর্ণনা লেখা।
তবুও এক মুসলমান কংগ্রেসীর, এক কৃষক-প্রজা আন্দোলন কর্মীর, এক সুসাহিত্যিক এবং একজন রাজনীতিবিদের কলমে নিজের সময়ের ছবিকে অঙ্কন যথেষ্ট সুখপাঠ্য হয়েছে তা অস্বীকার করা মিথ্যার সমতুল্য হবে।
বইটি পড়তে বা ডাউনলোড করতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন...
No comments:
Post a Comment